(১) মানুষ হচ্ছে প্রচন্ড রকম ভাবে প্রভাবিত এক প্রাণি। সে প্রভাবিত হয় তার আশেপাশের মুনষকে দেখে, সে শেখে তার পারিপার্শ্বিক পরিবেশ থেকে, এমনকি তার চিন্তাও নিয়ন্ত্রিত হয় পারিপার্শ্বিক পরিবেশ ও কাছের মানুষের দ্বারা। বিভিন্ন সময়ে যে ট্রেন্ড দেখা যায়, এটা কিন্তু এই প্রভাবণেরই ফল। ইদানিংকালে আমাদের দেশে অনেক সৌন্দর্যসচেতনতা দেখা যাচ্ছে। এটা খুবই ভাল, যদি সেটা হয় নিজের ভাল লাগা বা সখের জায়গা থেকে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এর ব্যত্যায় লক্ষ্য করা যায়।

সৌন্দর্য চর্চা হচ্ছে শরীরকেন্দ্রিক চিন্তাভাবনা। অনেকেই মনে করেন আমি যতটা সুন্দর হব, আমি যতটা আকর্ষণীয় হব, ততই আমাকে দেখে সবাই আমার সৌন্দর্যের প্রশংসা করবে। কিন্তু আমি যে সৌন্দর্যের কথা ভাবছি সেটা তো আমার প্রকৃত সৌন্দর্য নয়, আমার এই বহিরাবরণ দেখে যদি কেউ প্রশংসা করে তাহলে কি আমি সেই প্রশংসার যোগ্য? এটা কি জালিয়াতি নয়? কেউ যদি আমার এই সৌন্দর্য দেখে প্রশংসা করে, প্রসাধনী ছাড়াও কি সে সেই প্রশংসা করবে? যে মুখ দেখে আজ আমার বিয়ে হচ্ছে, ফাউন্ডেশনের প্রলেপ ধুয়ে ফুলশয্যার পরে কি সেই সৌন্দর্যে সে খুশি থাকবে। তার মনের ভিতর কি না পাওয়ার একটা আক্ষেপ থাকবে?

অনেকে বলে থাকেন – “আমি শুধু নিজের জন্য সাজগোজ করি”। তাহলে কথা হচ্ছে তুমি বাসায় থাকার সময় কেন সাঁজো না, কেন শুধু কোন অনুষ্ঠান বা বাইরে যাবার সময়ই সাঁজো? অর্থাৎ অবচেতনভাবেই এই সৌন্দর্য প্রদর্শনের বিষয়টা থাকে অন্যকে দেখানোর জন্য। অন্যের থেকে বাহবা পাবার জন্য। আর এই ধারণার জন্ম হয়েছে অন্যের দেখাদেখি।

কিন্তু তুমি একটু চিন্তা করে দেখো! এই সৌন্দর্য তো ক্ষণস্থায়ী। ২০ বছর পরে তোমার এই সৌন্দর্য আর থাকবে না। যে সৌন্দর্য ফেসওয়াশ দিয়ে ধুয়ে ফেলা যায় সেই সৌন্দর্যের লাভটা কি? ক্ষণস্থায়ী কোন কিছুর পিছনে দৌড়ানো তো জ্ঞানীর লক্ষণ নয়। মূলত সৃষ্টিকর্তা যাকে যেভাবে সৃষ্টি করেছে সে সেভাবেই সুন্দর, আমাকে যদি অন্যরুপে ভাললাগত তাহলে তিনি আমাকে অন্য রুপেই প্রেরণ করতেন। নিজেকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা জরুরি, সাঁজিয়ে রাখা নয়।

(২) আমি আমার সমবয়সী বা আমার থেকে সামান্য ছোট এক মেয়েকে চিনি যে কিনা ছোটবেলা থেকেই ভাবত বিয়েই তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। ১২/১৩ বছর বয়স থেকেই তার সমস্ত চিন্তা ছিল তার স্বামীকেন্দ্রিক। ঐ বয়সে ঘর গৃহস্থালির কাজও শিখে নিয়েছিল ভালভাবেই। স্বামীকে সুস্বাদু রান্না করে খাওয়াবে বলে রান্নাও শিখে নিয়েছিল অনেক। পড়াশোনাও খুব বেশি করেনি। তারকাছে পড়াশোনার থেকেও গৃহস্থালির কাজকর্মই বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

একদিন তার সেই মহেন্দ্রক্ষণ আসল। বিয়ে হয়ে গেল। এখন তিনি তিন সন্তানের জননী। একটা সতীনও আছে। মাঝে মাঝে ঝগড়া হয়। রাগ করে বাপের বাড়িও চলে আসে। আবার সব ঠিক হয়ে যায়। একদিন দেখা হলে জিজ্ঞেস করলাম – “কি রে! সংসার কেমন চলছে?” দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল – “ভালই আছি রে, মনে সুখ নেই”। বুঝতে বাকি থাকেনা কেন মনে সুখ নেই। কথা না বাড়িয়ে অন্য প্রসঙ্গে কথা শুরু করলাম।

স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক মেয়েকেই দেখেছি এই ধরণের চিন্তা ভাবনার (বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এই সংখ্যা মোটামুটি কম), অনেকে লেখাপড়া করে শুধু ভাল একজনকে পাবার জন্য। এইযে এমন বদ্ধ ধারণা, এটাও কিন্তু পরিবেশ বা সংস্কৃতির থেকে পাওয়া।

কেউ যদি ছোটবেলা থেকে একই জিনিস দেখে দেখে বড় হয়, তার কাছে সেটাই নিয়ম বলে মনে হয়।

এইযে এই দুই ধরণের বাঁচা, দুটোই কিন্তু প্রায় একই জিনিস। একটাতে অন্যের মনোরঞ্জনের জন্য বাঁচা, আর অন্যটা অন্যের জন্য বাঁচা। কোনটাই নিজের জন্য নয়। সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত আমার এই সুন্দর জীবনটাতে  আমি কই? একজন পুরুষ ও নারীর ভিতরে তো কোন পার্থক্য নেই। নারী-পুরুষ দুজনেই ডিম্বানু আর শুক্রাণুর মিলনে জন্ম, দুজনেই তো জন্মের পরে মাতৃদুগ্ধ পান করে বেড়ে ওঠে, দুজনেরই তো সমান সংখ্যক হাত, পা, চোখ, মুখ আছে। তাহলে কেন এই ক্ষণস্থায়ী সুখের জন্য বেঁচে থাকা? কেন আমার জীবনকে ঠিক একই রকম অন্য আর একজনের জন্য উৎসর্গ করা?

তাহলে উপায় কি? উপায় হচ্ছে, সবসময় সুখী থাকতে নিজের জন্য বাঁচতে হবে। নিজের জন্য বাঁচা কি সেটা বুঝতে হলে, নিজেকে জানতে হবে, আর নিজেকে জানতে হলে বিচক্ষণ হতে হবে, বিচক্ষণ হতে হলে জ্ঞানী হতে হবে, আর জ্ঞানী হতে হলে জ্ঞানার্জন করতে হবে। হাজার বছর আগে মানুষ অন্যকে মূল্যায়ন করত পেশি শক্তি দিয়ে। কিন্তু এখন যুগ বদলেছে, এখন যে বেশি জ্ঞানী সেই শক্তিশালী। হাজার বছর আগে যারা তোমাকে শারীরিকভাবে দুর্বল বলে পিছনে ফেলে রেখেছে, তাদেরকে তোমরা রোবট বানিয়ে দেখিয়ে দাও, জায়ান্ট ক্রেন বানিয়ে দেখিয়ে দাও, জানিয়ে দাও শারীরিক শক্তিতে মাপার দিন শেষ।

পরিশেষে, বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে।

জানো, শেখো, নিজের জন্য বাঁচো।